স্পার্ক প্লাগের রং দেখেই বলে দিন ইঞ্জিনের অসুখ!
ডাক্তার রক্ত পরীক্ষা করে শরীরের খবর বলেন। মেকানিকের কাছে তেমনই একটি পরীক্ষা হলো স্পার্ক প্লাগ দেখা। ছোট্ট এই পার্টসটির মাথার রং অনেক সময় বলে দেয় ইঞ্জিনের ভেতরে আসলে কী চলছে।
সুখবর হলো, এটি দেখতে আপনার বড় মেকানিক হওয়ার দরকার নেই। মাত্র একটি প্লাগ রেঞ্চ আর কয়েক মিনিট সময় হলেই চলবে।
স্পার্ক প্লাগ কী কাজ করে?
- সিলিন্ডারের ভেতরে বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করে।
- এই স্ফুলিঙ্গেই বাতাস ও পেট্রোলের মিশ্রণ জ্বলে ওঠে।
- এখান থেকেই ইঞ্জিন শক্তি পায়।
- দহনের তাপের একটি অংশ বের করে দিতেও সাহায্য করে।
স্ফুলিঙ্গ দুর্বল হলে মিশ্রণ পুরোপুরি পোড়ে না। ফলে শক্তি, মাইলেজ ও স্টার্ট তিনটিতেই সমস্যা হয়।
প্লাগের রং কী বলছে?
- হালকা বাদামি বা ধূসর-বাদামি: সবচেয়ে ভালো লক্ষণ। ইঞ্জিনের মিশ্রণ ও তাপ মোটামুটি ঠিক আছে।
- শুকনো কালো গুঁড়া: মিশ্রণে পেট্রোল বেশি বা বাতাস কম। ময়লা এয়ার ফিল্টার, কার্বুরেটর সেটিং বা বেশি চোক এর কারণ হতে পারে।
- ভেজা কালো ও তেলতেলে: ইঞ্জিন অয়েল দহন কক্ষে ঢুকছে হতে পারে। পিস্টন রিং বা ভালভ সিল পরীক্ষা করা দরকার।
- পেট্রোলে ভেজা: বারবার স্টার্টের চেষ্টায় ইঞ্জিন ফ্লাডেড হতে পারে, অথবা স্ফুলিঙ্গ দুর্বল।
- খুব সাদা বা ছাই রঙের: ইঞ্জিন বেশি গরম হচ্ছে বা মিশ্রণে পেট্রোল কম। দ্রুত পরীক্ষা করান।
- গলে যাওয়া বা ফোস্কা পড়া ইলেকট্রোড: অতিরিক্ত তাপের গুরুতর লক্ষণ। বাইক না চালিয়ে কারণ খুঁজুন।
- হলুদ বা লালচে আস্তর: জ্বালানির সংযোজক থেকে জমতে পারে। ফুয়েলের মান নিয়েও ভাবুন।
সঠিকভাবে “রিডিং” নেবেন যেভাবে
- বাইক স্বাভাবিকভাবে কিছুক্ষণ চালিয়ে ইঞ্জিন গরম করুন।
- ইঞ্জিন বন্ধ করে ঠান্ডা হতে দিন। গরম ইঞ্জিনে হাত দেবেন না।
- প্লাগ ক্যাপ ধীরে খুলুন। তার ধরে টানবেন না।
- প্লাগের চারপাশের ধুলা মুছে নিন, যেন ভেতরে না পড়ে।
- প্লাগ রেঞ্চ দিয়ে সোজা করে খুলুন।
- ভালো আলোতে মাথার রং দেখুন।
শুধু আইডলে চালিয়ে বা ঠান্ডা স্টার্টের পর রং দেখলে ভুল ধারণা হতে পারে।
প্লাগ নষ্ট হওয়ার লক্ষণ
- সকালে স্টার্ট নিতে সমস্যা হয়।
- চলার সময় ইঞ্জিন হোঁচট খায় বা মিসফায়ার করে।
- পিকআপ দুর্বল লাগে।
- মাইলেজ কমে যায়।
- আইডল অস্থির থাকে।
- ইলেকট্রোড ক্ষয়ে গ্যাপ বড় হয়ে যায়।
- সাদা ইনসুলেটরে ফাটল দেখা যায়।
গ্যাপ মাপা কেন জরুরি?
- দুই ইলেকট্রোডের মাঝের ফাঁককেই গ্যাপ বলে।
- গ্যাপ বেশি হলে স্ফুলিঙ্গ দুর্বল বা অনিয়মিত হতে পারে।
- গ্যাপ কম হলে স্ফুলিঙ্গ ছোট হয়, দহন ভালো হয় না।
- সঠিক মাপ ম্যানুয়ালে লেখা থাকে।
- ফিলার গজ দিয়ে মেপে আলতো করে ঠিক করতে হয়।
- ইরিডিয়াম বা বিশেষ প্লাগে সূক্ষ্ম ইলেকট্রোড সাবধানে সামলান, গ্যাপ চেষ্টা না করাই ভালো।
প্লাগ বদলানোর সঠিক ধাপ
- ইঞ্জিন ঠান্ডা করে পুরোনো প্লাগ খুলুন।
- ম্যানুয়াল অনুযায়ী সঠিক নম্বরের প্লাগ নিন।
- গ্যাপ মিলিয়ে নিন।
- নতুন প্লাগ প্রথমে হাতে প্যাঁচিয়ে বসান। এতে প্যাঁচ কেটে যাওয়ার ঝুঁকি কমে।
- এরপর রেঞ্চ দিয়ে নির্ধারিত মাপে টাইট দিন।
- ক্যাপ শক্ত করে বসান, “ক্লিক” অনুভব করুন।
- স্টার্ট দিয়ে কিছুক্ষণ চালিয়ে দেখুন।
এই ভুলগুলো এড়িয়ে চলুন
- গরম ইঞ্জিনে তাড়াহুড়া করে প্লাগ খোলা
- অতিরিক্ত টাইট দিয়ে সিলিন্ডার হেডের প্যাঁচ নষ্ট করা
- ম্যানুয়ালের নম্বর না দেখে গরম বা ঠান্ডা রেঞ্জের ভুল প্লাগ লাগানো
- স্টিলের ব্রাশ দিয়ে জোরে ঘষে ইনসুলেটর নষ্ট করা
- ফাটা প্লাগ ক্যাপ বা তার না বদলানো
- শুধু প্লাগ বদলে আসল কারণ না খোঁজা
সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
- কত দিন পর প্লাগ বদলাবো? এটি নির্ভর করে প্লাগের ধরন ও ম্যানুয়ালের উপর। প্রতি সার্ভিসে অন্তত একবার খুলে দেখে নিন।
- ইরিডিয়াম প্লাগ দিলে কি মাইলেজ অনেক বাড়বে? এটি সাধারণত বেশি দিন টেকে এবং স্ফুলিঙ্গ স্থির রাখে। তবে ইঞ্জিন সুস্থ থাকলে মাইলেজে বড় অলৌকিক পরিবর্তন আশা করবেন না।
- কালো প্লাগ পরিষ্কার করে আবার লাগানো যাবে? শুকনো কার্বন হলে নরম ব্রাশে পরিষ্কার করে সাময়িকভাবে চলে। ইলেকট্রোড ক্ষয়ে গেলে নতুন লাগানোই ভালো।
- প্লাগ ঠিক থাকলেও স্ফুলিঙ্গ না এলে? তখন প্লাগ ক্যাপ, ইগনিশন কয়েল বা সিডিআই ইউনিট পরীক্ষা করতে হতে পারে।
রাস্তায় বিপদে কাজে লাগবে যে অভ্যাস
- টুল কিটে একটি ভালো অতিরিক্ত প্লাগ রাখুন।
- প্লাগ রেঞ্চটি সবসময় সিটের নিচে রাখুন।
- কালো প্লাগ পেলে একটি পরিষ্কার কাপড় কাজে দেয়।
- দীর্ঘ ট্যুরে যাওয়ার আগে প্লাগ খুলে অবস্থা দেখে নিন।
- কবে প্লাগ বদলালেন, তার কিলোমিটার লিখে রাখুন।
কালো বা সাদা প্লাগ দেখলে শুধু প্লাগ বদলে দিলেই সমস্যা শেষ হয় না। নতুন প্লাগও কিছুদিন পর একই রঙের হবে, যতক্ষণ না আসল কারণ ঠিক হয়।
আপনার বাইকের জন্য সঠিক স্পার্ক প্লাগ বেছে নিন বাইক বাজার থেকে। পরের বার প্লাগ খুললে তার রংটা একবার মনোযোগ দিয়ে দেখবেন। আপনার ইঞ্জিন হয়তো কিছু বলতে চাইছে।